রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১০)

আমি জঙ্গল এর পথ ধরে একা একা হাটছিলাম, সারাদিন প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম, কোনো খাবার জোগাড় করতে পারি নি,
দুই দিন না খেয়ে ছিলাম,

রাস্তা ছিল নিস্তব্ধ, কোনো সাড়া শব্দ ছিল না, দূর থেকে শিয়াল ডেকে যাচ্ছিল আপন মনে, বার বার শিউড়ে উঠেছিলাম
সেই হাড় হিম করা ডাক শুনে, মনের মধ্যে এক অজানা ভয় কাজ করছিল, গায়ে ছিল না তেমন কোনো কাপড়, ক্ষুধার পেট সাথে রাতের সেই ঠান্ডা,
সব মিলিয়ে রাস্তার এক নেরি কুকুর এর মতো অবস্থা হয়েছিল
আমার,,

একটু দূরেই ছিল জঙ্গল, কিন্তু সেখানে আর পৌছাতে পারলাম না, তার আগেই সামনে এসে হাজির হলো কয়েকটা হিংস্র হায়েনা,,তাদের মুখ দিয়ে গড়িয়ে পরছিল ক্ষুধার লালা, আর তাদের জীর্ণ শীর্ন দেশগুলো বলে দিচ্ছিল যে তারা কতদিন না খেয়ে আছে, আর আজ তারা যে আমার মাংস ছিড়ে খাবে তা আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, তারা তাদের ওই ধারালো পায়ের নখ নিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগলো আমার দিকে,,

আর আমার দুর্বল শরীর তাদের ওই নখ থেকে বাঁচার জন্য পিছনের দিকে যেতে লাগলো,, ঠিক যখন ওই জানোয়ার গুলো আমার উপর হামলে পড়ার প্রস্তুতি নিবে তখন আমি আমার চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলি, জানতাম এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে এদের সাথে পারবো না, তাই মৃত্যু কে গ্রহণ করাই আমার পক্ষে শ্রেয়,
ঠিক সেই সময় আমি আমার হাতে কারো হাতের স্পর্শ পেলাম,
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি সামনের হায়েনা গুলো দুইটা মুরগি নিয়ে মারামারি করছে আর যে আমার হাত ধরে ছিল সে আর কেউ নয় সে হলো আমার বড় মা,

তিনি কথা না বাড়িয়ে আমার উদ্দেশ্যো বললো যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে যেতে হবে,, এরা মুরগি নিয়ে যতক্ষণ ব্যস্ত আছে ততক্ষণে আমাদের এখান থেকে চলে যেতে হবে,,
আমি তার সাথে চলে গেলাম,, সে আমাকে নিয়ে এলো এই বাড়িতে,, আর সেই ওই মুরগি ওই পশুদের দিয়ে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে,
সে আমার কাছ থেকে আমার সব কথা শুনলো, আর আমাকে বললো এখন থেকে আমি যেনো তার বাড়িতে থাকি, আর তাকে যেনো নিজের মায়ের মতো ভাবি, আর সেই তখন থেকেই আমি তাকে বড় মা বলে ডাকি,, কারণ যে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে সে যদি মা হয় তাহলে যে এই পৃথিবীতে বাঁচিয়েছে সে কেনো বড় মা হবে না,, তখন থেকে আমি এই বাড়িতে আছি, আর রাকেশ সে ছিল আমার বন্ধুর মতো, চলাফেরা করতে পাড়তো না নিজে থেকে,
কারণ সে মানসিক প্রতিবন্ধীর সাথে সাথে ছিল বিকালঙ্গ,

সাদিক, আকাশ আর রীতি তীথির দিকে তাকিয়ে দেখলো সে কাঁদছে, আত্মাদেরো চোখের পানি আছে কিনা তা সাদিক রা জানে না, এটাও জানতো না যে আত্মাদেরো একটা মন থাকে, আর তারাও ভালো মন্দ বোঝে,,
আকাশ বললো এটা তো শুধু আপনার কাহিনী বললেন,
ওই যে উনি, আসলাম এর দিকে আঙুল তুলে,
উনি কে হোন,,,
আসলাম বলতে আরম্ভ করলো,
আমি আসলাম, ছোট বেলা থেকেই আমি ছিলাম অনাথ শিশু, আমাকে দেখার মতো কেউ ছিল না, পথে পথে ঘুরে বেড়াতাম,
এই বাড়িতে কাজ করে না হয় ওই বাড়িতে দিনমজুর খেটে নিজের পেট চালাতাম, নিজে খেয়ে না খেয়ে পুরো দিন চলছিল
অনেক কষ্ট করে নিজের দিন চালাতে হতো, আর কেউ আমার খোঁজ নিতো না,
বাবার অনেক সম্পত্তি ছিল, কিন্তু চাচা আর চাচী সমস্ত সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়ে আমাকে রাস্তার কুকুর এর মতো বের করে দেয় আমারই বাড়ি থেকে, তারা আমাকে বের করে দিয়ে সেই বাড়িতে রাজত্ব শুরু করে দেয়, তারা সেখানে রাজার হালে
থাকতো আর আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফকির এর মতো চলতাম, মানুষের দিন মজুরি করে আর সারাদিন কষ্ট করে দিন শেষে মিলতো শুধু দুটো রুটি,
একদিন বৃষ্টির পানিতে ভিজে আমার প্রচন্ড জ্বর আসে, আর
বিছানা তে পরে থাকতে হয় তিন দিন, কাজে না যেতে পাড়ায় কোনো রকমের খাবার জোটে নি ভাগ্যে, যার ফলে প্রায় মরেই
যাচ্ছিলাম আমি,
কিন্তু সেই সময়ে ফেরেশতার মতো হাজির হয় বড় মা, তিনি আমাকে খাবার দিয়ে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে আর আমাকে নিয়ে যায় তাদের বাড়িতে,,
আমাকে তার নিজের সন্তান এর মতো ভালোবাসে, তার প্রতি প্রতিদিন কৃতজ্ঞ হয়ে যাচ্ছিলাম,
একদিন আমি বেরিয়ে পড়ি নিশি রাতে, হাতে ছিল একটা চকচকে ছুরি, লক্ষ ছিল আমার বাবার বাড়ি,, যেখান থেকে একদিন আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, আর সেখানে এখন সুখে শান্তিতে বাস করছে আমার চাচী নামক ডাইনি,

আমি নীরবে চলে যাই সেখানে আর বাড়ির সব কিছু চেনা থাকাতে ভিতরে যেতে কোনো কষ্ট হয় নি,
আস্তে আস্তে আমি চলে যাই আমার বাবার ঘরে, যেখানে আরাম করে ঘুমাচ্ছিল আমার ডাইনি চাচী আর চাচা,
আমার ঘুম হারাম করে দিয়ে তাদের ঘুম আমি দেখতে পারছিলাম না,,, তাই আর দেরি না করে আমার হাতের ছুরি সোজা চালিয়ে দেই আমার চাচার গলায়,, শুধু একটু ছটফট করে নিস্তেজ হয়ে যায়, চাচীও এইদিকে জেগে যায়,
যেই সে চিল্লাতে যাবে তাকেও বসিয়ে দেই কয়েকটা কোপ,,
তাদের রক্ত দেখে যেনো আমি শান্তি পাই,, তাদের লাশ আমি ওই বাড়ির পিছনে পুতে দেই,, আর বড় মা কে এসে সব খুলে বলি, বড় মা আমাকে অনেক মারে, তার পর আমাকে বুঝায় যে আমি যা করেছি ভূল করেছি, তাই আর ভবিষ্যতে যেনো এই রকম কাজ না করি, সব সময় যেনো মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করি,,
এর পর থেকে আমি এই বাড়িতেই থাকি, বড় মার সব কথা মেনে চলি,, সব সময় শান্ত হয়ে থাকি,, আর রাকেশ ভাই এর দেখাশোনা করি….

সাদিক আনমনেই বলে দিলো মনে হয় বড় মা বড্ড ভালো মানুষ ছিলেন, যদি তাকে একবার দেখতে পেতাম,
আকাশ তার কথা শুনে বললো সেই আশা পূরণ হওয়ার নয়,
কারণ তারা তো বেঁচে নেই,,,

আকাশ এর কথা শেষ হতেই একসাথে ওরা তিনজন হুঙ্কার দিয়ে উঠলো, আর বললো ওরা বেঁচে আছে আর ওরা ফিরে আসবে,, ওরা ফিরে আসবেই,, যদি একবার বলিস ওরা মারা গেছে তাহলে আর এক মুহূর্তের জন্যও বাঁচবি না তোরা,,,
সাদিক রা আবার চুপ হয়ে গেলো, কারণ তারা বুঝতে পারছে
এরা এদের বড় মাকে এতটাই ভালোবাসে যে এরা বিশ্বাস করে না যে তারা মারা গেছে,,

সাদিক তাদের বললো কিন্তু এই যে এই বাচ্চা ছেলে এটা কে,
এও কি তোমাদের মতো অনাথ, একেও কি তোমাদের বড় মা আশ্রয় দিয়েছে, আমরা কি জানতে পারি কি জন্য তোমরা এখানে পরে আছো, কি তোমাদের উদ্দেশ্য,

তিথী বললো সব জানতে পারবি, তার আগে তোদের ব্যাপারে বল, তোরা কিভাবে এখানে এলি,, এখানেই তোদের কেনো আসতে হল, আর ওই শয়তান দের সাথে তোদের কি করে শত্রুতা হলো,
সাদিক তাদের বিষয়ে সব খুলে বললো, আর কি করে জুবায়ের এর সাথে তাদের মারামারি হলো তা সব খুলে বললো,
এর পর সাদিক তাদের বললো এখন ওই ছেলের ব্যাপারে বলো, আমরা শুনতে চাই, আমরা অনেক আগ্রহী,,

তিথী বলতে শুরু করলো…

চলবে..

About সাদিক হাসান

Check Also

রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৫)

পাগল টা সাদিক দের বললো আমার কাজ আমি করেছি এখন তোদের কাজ বাকি, তোরা এখন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *