রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১১)

তিথী সাদিক এর সব কথা শুনে বললো তাহলে তোরা সত্যি কথা বলছিস, আর তোদের কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে সেই অনুযায়ী তোরা ভালো মানুষ, যাই হোক তোরা এই বাড়িতে এসে ভুল করেছিস যার শাস্তি তোকে পেতেই হবে, তার আগে তোদের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আমাদের এখানে থাকার উদ্দেশ্য বলছি,
তিথী আবার বলতে শুরু আরম্ভ করলো,
সে সুমন কে উদ্দেশ্য করে বললো ও হলো সুমন, বয়স মাত্র তেরো বছর, এই বয়স থেকেই সে আমাদের সাথে থাকত সেটা একদমই নয়,
সে এখানে আসে আরো তিন বছর আগে, যখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর, তখন তার সব ছিল, বাড়ি ঘর, টাকা পয়সা,
আর সবচেয়ে বড় জিনিস যেটা ছিল সেটা হলো মা বাবার ভালোবাসা, যেটা আমাদের কারো নেই, সে খুব সুখে শান্তিতে বসবাস করতো তার পরিবার এর সাথে, সারাদিন খেলা ধুলা আর আনন্দ ফুর্তি করেই ওর দিন চলে যাচ্ছিল,
কিন্ত মনে হয় আল্লাহর তার এই সুখ পছন্দ হয় নি, তাই তিনি ওই ছোট্ট শিশুর সুখ কেড়ে নেওয়ার জন্য পাঠালেন আজরাইল কে ডাকাত রূপে,
সুমন দের যেহেতু টাকার কোনও অভাব ছিল না তাই ডাকাত রা তাদের বাড়িতে হামলা করে আর কেড়ে নেয় সব কিছু, আর যাওয়ার আগে ওই ছোট্ট শিশুর সামনে ধর্ষণ করে যায় তার মাকে, আর তারপর তাদের দুই জন কে গলা কেটে মেরে রেখে চলে যায়,, হয়তো ডাকাত দের সুমন এর প্রতি মায়া হয়েছিল তাই তারা তাকে আর মেরে ফেলে নি,
সুমন কে ওইভাবে রেখেই চলে যায়, সে পড়ে ছিল তার মা বাবার নিথর রক্তাক্ত মৃত দেহের সামনে,, তখন থেকে তার মাথায় গোলমাল শুরু হয়ে যায়, সে আস্তে আস্তে ভুলে যেতে থাকে সবকিছু, তার আর কিছু মনে থাকে না,
মাঝে মাঝে হঠাৎ করে ঘুমের মাঝে চিৎকার করে উঠে, হয়তো তার সেই বীভৎস অতীত তাকে শান্তি মতো ঘুমাতেও দেয় না,,
তাঁকে তারা করে বেড়ায় সব সময়,

এর পরে সুমন রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকতো, পাগলের মতো হয়ে যায় সে, কিন্তু এই নিষ্ঠুর দুনিয়া তার কষ্ট কে বোঝার চেষ্টাও করে না, তাকে কেউ মাতৃস্নেহে কাছেও টেনে নেয় না,
সে তো অবুঝ শিশু, তার কি দোষ ছিল, আল্লাহ কেনো তার সাথে এমন করলো,,
কিন্তু সেই সময় বড় মা তাকে দূরে ফেলে দেয় নি, তিনি ওকে আশ্রয় দেয়,, মাতৃস্নেহে তাকে আগলে রাখে, তাকে ভালোবাসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে,,
সুমন বড় মাকে খুব ভালোবাসতো,,তাই বড় মাকে নিয়ে যারা খারাপ কথা বলত তাদের প্রতি অনেক রেগে যেতো, সুমন বড় মার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতো, সুমন সব সময় রাকেশ এর সাথে খেলা করতো,এই ভাবেই সুখে দিন যাচ্ছিল আমাদের,,

সাদিক বললো সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এটা এখনো জানতে পারলাম না যে আপনারা এখানে কেনো আছেন, আর আপনারাই বা মারা গেলেন কি করে আর এই বড় মা বা রাকেশ এর সম্পর্কে আমাদের কিন্তু আপনারা কিছুই বলেন নি,,

সুমন এতক্ষণ বাড়ির উঠোনে দৌড়া দৌড়ি করছিল, সেটা বললে ভুল হবে কারণ সে একবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল আর একবার অন্য জায়গায় গিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছিল,, সে সাদিক দের কথা শুনে এক লাফে সাদিক এর সামনে আসে আর বলে খেলবে আমার সাথে,, জানো অনেক দিন ধরে কেউ আমার সাথে খেলা করে নি, রাকেশ ভাইয়া তো খেলতো আমার সাথে, কিন্তু সেও কোথায় যেন হারিয়ে গেলো,,

তার কথা শুনে সাদিক শুধু করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল,, আর অপরদিকে রীতির চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরছিল, সে তার আঁচল দিয়ে সাবধানে তার চোখের পানি মুছে নিলো,, আর সুমন এর গালে হাত দিয়ে আদর করতে চাইলো, কিন্তু সে ব্যর্থ হলো কারণ তার হাত সুমন এর দেহ ভেদ করে বেরিয়ে গেলো,
কারণ তার তো কোনো নির্দিষ্ট দেহ নেই, সব তো ছায়া মাত্র,,

কিন্তু রীতি থামল না, সে তাকে বললো চলো কি খেলতে চাও,
আমিও তোমার সাথে খেলব, জানো আমারও খেলার মতো কেউ নেই,
সুমন রীতির কথা শুনে খুশি হলো আর বললো আমি দৌড়াবো আর তুমি আমাকে ধরবে কেমন, রীতিও তার কথায় সম্মতি দিলো আর খেলতে শুরু করলো,,
তাদের খেলা দেখে তিথী আর আসলাম এর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো,, কারণ এতো বছর পর সুমন এই ভাবে খুশি হয়েছে,, তারা যে ছায়া, অতৃপ্ত আত্মা, তাদের চোখের পানি দেখার ক্ষমতা সাদিক দের নেই, কিন্তু সেও রীতির বাচ্চামো দেখে অবাক না হয়ে পড়লো না, সে এই পরিস্থিতিতেও নতুন করে রীতির প্রেমে পড়তে শুরু করলো, তারা সবাই সুমন রীতির হাসি মুখে খেলা মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছিল,

তারা যখন খেলছিল তখন তিথী সাদিক দের সামনে আসে আর বলে তোরা আসলেই ভালো মানুষ, তোদের ভিতরে কোনো পাপ নেই, তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তোদের মুক্তি দেবো,
কিন্তু তোদের কেও প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে এখানকার কথা তোরা ভুলে যাবি, আর মনে রাখবি না যে তোরা এখানে এসেছিলি,
আকাশ খুশি হয়ে তাদের অনেক ধন্যবাদ দেয়, কিন্তু সাদিক বলে আমরা এখান থেকে সব কথা না শুনে যাবো না, আর আমরাও বুঝতে পারছি যে তোমরাও অনেক ভালো, তোমাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই, তাই যদি পারি তো আমরা তোমাদের লক্ষ পুরোণে যথাসম্ভব চেষ্টা করবো,,

সাদিক এর কথা শুনে তিথি বললো, বেশ তাহলে শোন,
বড় মা ছিল একজন খুব ভালো মহিলা, তিনি সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল তার স্বামীর সাথে, কিন্তু যখন তার বাচ্চা পেটে তখন তার স্বামী মারা যায় আর তার শশুর বাড়ির লোকেরা তাকে দেখা শুনা করে, কিন্তু তারা তাকে খুব একটা পছন্দ করতো না,
শুধু বংশ রক্ষার জন্য তাকে রেখে দিয়েছিল,
কিন্তু যখন দেখলো তাদের বংশধর একজন প্রতিবন্ধী শিশু তখন সেই মাসুম বাচ্চা সহ বড় মাকে বের করে দেওয়া হয় সেই বাড়ি থেকে, আর বড় মা আসে তার বাপের বাড়িতে আর এটাই হলো সেই বাড়ি,, আমরাও থাকতাম তার সাথে,, অনেক ভালো মতোই চলছিল আমাদের দিন,
এখানে কিন্তু হঠাৎ একদিন রাকেশ এর শরীর খুব খারাপ হয়ে যায়,, এবং ডাক্তারের বাড়ি এখান থেকে অনেক দূরে ছিল,, সেদিন ছিল আমবস্সার রাত,, সেই রাতে আসলাম বড় মার সাথে ডাক্তার এর বাড়ি পর্যন্ত যেতে চায়, কিন্তু বড় মা কাউকে সাথে নেয় নি,,

তিনি একাই সেই রাতে বেরিয়ে পড়ে ডাক্তার এর উদ্দেশ্যে,
যাওয়ার আগে আমাদের বলে যায় যে আমরা যেনো তার ফিরে না আসা পর্যন্ত এই বাড়িতেই থাকি আর আমরা যেনো কোথাও না যাই,, এই বাড়িতে থেকে যেনো আমরা বাড়ি পাহারা দেই,, আর তিনি এটাও বলে যান যে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি ফিরে আসবেন,, আজ পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল কিন্তু তিনি ফিরে আসে নি, আমরা এখনো তাদের অপেক্ষায় এখানে পরে আছি,
তারা এখানে আসলেই তাদের হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে আমরা চলে যাবো,, আর কেউ যদি এই বাড়িতে প্রবেশ করে আমরা তাকে মেরে ফেলে দেই,,,

সাদিক বললো এখন বুঝলাম,, কিন্তু এটা এখনো বুঝতে পারছি না যে তোমরা মারা গেলে কি করে,,
তিথি আবার বলতে শুরু করলো,
ততক্ষণে রীতি আর সুমন ও ক্লান্ত হয়ে তাদের পাশে এসে বসেছে, তিথি বলতে শুরু করলো সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা……

চলবে…

About সাদিক হাসান

Check Also

রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৫)

পাগল টা সাদিক দের বললো আমার কাজ আমি করেছি এখন তোদের কাজ বাকি, তোরা এখন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *