রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৬)

সাদিকদের নৌকা যখন ঠিক মাঝ নদী বরাবর তখন হঠাৎ করে একটা পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়ে তাদের নৌকা আলাদা হয়ে যায়, সব ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়, তাদের নৌকা টি একটা পাথরের সাথে আঘাত পেয়েছিল, আর যেটা সাদিক ঘুনাক্ষরেও টের পাই নি যার ফল স্বরূপ তাদের পড়তে হলো সেই ক্ষরস্রোতা নদীতে, কিন্তু তাদের সবাই সবার সাথে জুড়ে ছিল সেই দরির মাধ্যমে, কিন্তু সাদিক আর আকাশ সাঁতার জানলেও রীতি সাঁতার জানে না, তাই সে ডুবে যেতে লাগলো,
ওই অবস্থায় সে তৎক্ষণাৎ সেন্সলেস হয়ে যায়, সাদিক আর আকাশ অনেক কষ্ট করে নদীর কারেন্ট এর সাথে লড়াই করে পাড়ে উঠতে সক্ষম হয়, কিন্তু রীতি না উঠার ফলে সাদিক আবার কোনো চিন্তা না করেই নদীতে ঝাঁপ দেয় আর এগিয়ে যেতে থাকে সেই দরি ধরে, এক পর্যায়ে সে রীতিকে হাতের নাগালে পায় আর
তার বাহু ধরে এগিয়ে নিয়ে আসতে থাকে সাদিক, এই দিকে আকাশও বসে থাকে নি, সেও দরির এক প্রান্ত ধরে তাদের টেনে আনতে থাকে,,

এক পর্যায়ে তারা রীতি কে তুলে আনতে সক্ষম হয়, সাদিক রীতির বুকে চাপ দিয়ে পানি বের করতে থাকে, কিন্তু পানি বের হবার পরেও রীতি চোখ খোলে না, তখন সাদিক দিক বে দিক না ভুলে সরাসরি তার মুখ রীতির মুখে গুঁজে দেয় আর অক্সিজেন দিতে থাকে তাকে, আকাশ শুধু বোকার মত চেয়ে চেয়ে দেখছিল, একটু পর রীতি কেশে উঠে আর সাদিক তাকে ছেড়ে দেয়, আর আস্তে আস্তে রীতি উঠে বসে, বুঝতে পারে তার সাথে কি হয়েছিল, আর সাদিক দের তাকিয়ে বলে, আমি দুঃখিত, আমার জন্য তোমাদের এতো কষ্ট করতে হয়েছে,
সাদিক অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে ঠিক আছে,
আকাশ ততক্ষণে রীতির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আর রীতিকে উদ্ধার করার জন্য সাদিক কি কি করেছে তা খুলে বলে,
রীতি সব শুনে দৌড়ে যায় সাদিক এর কাছে আর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে তাকে আর বলে কেনো তোমার জীবন ঝুকি তে ফেলে আমাকে বাঁচাতে গেলে, আমাকে মরে যেতে দিলে না কেনো
সাদিক রীতির দিকে ঘুরে রীতি কে ঠাস করে পাঁচ আঙুল বসিয়ে দিলো রীতির গালে, আর বললো তুমি বোঝা না আমি তোমায় ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমি কি করে বাঁচতাম,
আমিও তো তিলে তিলে শেষ হয়ে যেতাম, বলেই সাদিক প্রচণ্ড আবেগে জড়িয়ে ধরে রীতিকে, রীতিও উপভোগ করতে থাকে সাদিকের এই রকম পরম আবেশ, সে ভুলে যায় চরের কথা, তার সব ব্যথা যেনো মুহুর্তের মধ্যেই দূর হয়ে যায়, কারণ সেও যে সাদিক কে ভালোবাসে, সাদিকের সব কিছু যেনো তার হৃদয়ে, তাকে সে নিজের চেয়েও ভালোবাসে,
আর আকাশ সরে আসে সেখান থেকে, কারণ সে তাদের মাঝে
বাম হাত হতে চায় না,,
সাদিক আর রীতি বসে পড়ে নদীর তীরে, উপভোগ করতে থাকে সেই সৌন্দর্য, তাদের হাত ছিল একে অপরের হাতের উপর, নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে হাতে হাত রেখে
এই সুন্দর প্রকৃতি উপভোগ করায় যেনো প্রকৃতি তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিল,
সাদিক কয়েক মুহূর্তের জন্যে ভুলেই গিয়েছিল যে তারা এখানে কি উদ্দেশ্যে এসেছিল, যখন তার এটা মনে পড়ে তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, আলো কমে আসছে ধীরে ধীরে, যেনো অন্ধকার আলোর ছিটে ফোটা মুছে দেওয়ার জন্য তেড়ে আসছে,
সাদিক বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো, আকাশ কে আশেপাশে দেখতে পেলো না, রীতিও দাঁড়িয়ে গেলো তার দেখাদেখি,

সাদিক এদিক সেদিক কি যেনো খুঁজতে লাগলো, একটু পরেই পরিষ্কার হলো সাদিক কি খুঁজছে, তার হাতে দেখা গেলো কয়েকটি নারকেল, নারকেল দেখার সাথে সাথে যেনো রীতির পেটের ভিতর খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা প্রকাশ পেলো, সে বুঝতে পারলো এতক্ষণ না খেয়ে থাকার ফল,, সাদিক এসে তার ছুরি দিয়ে নারকেল ছিলে পানি বের করে রীতিকে খেতে দিলো আর সে নিজেও খেলো, আর খাওয়ার পর নারকেলের কচি শাস খেয়ে একটু হলেও তাদের ক্ষুধা নিবারণ হল, দুই জনই গো গ্রাসে শেষ করলো সব নারকেল, আর তাদের খাওয়ার একটু পর এসে হাজির হলো আকাশ, তাকে দেখে প্রচণ্ড ক্লান্ত মনে হচ্ছিল, আর তার ব্যাগ যেনো কয়েক মন ভারী দেখেচ্ছিল,

আকাশ এসেই তার ব্যাগ ফেলে দিলো, ব্যাগ খুলে সেখান থেকে কয়েকটা ফল বেরিয়ে এলো, সাদিক রা বুঝতে পারলো কেনো আকাশের এই অবস্থা, ফল পাড়তে গিয়ে তার এই অবস্থা হয়েছে, সাদিক নদীর পারের নরম বালির উপর গা এলিয়ে দিলো, আর জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো, রীতি তাদের ভাগের নারকেলের কিছু পানি আকাশ কে খেতে দিলো,
আকাশ এক ঢোকে সব পানি শেষ করে দিলো, তার পর সে বলতে শুরু করলো,
তোরা যখন প্রেম করতে ব্যস্ত ছিলি আমি তখন চুপ করে বসে থাকি নি, বেরিয়ে পড়ি খাবার এর সন্ধানে, খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলে ঢুকে পড়ি, আর অনেক গুলো ফলের গাছ দেখতে পাই,
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সব ফল ছির গাছের উপর আর সেগুলো পাড়তেই আমার এই অবস্থা,,
সাদিক আকাশের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো, সাবাস,,
তোর জন্যই আমাদের আর না খেয়ে থাকতে হলো না,,

এই দিকে রাত নেমে এসেছে অনেক আগে, আকাশে কোনো চাঁদ নেই, শুধু মিট মিট করে জ্বলছে কয়েকটা তারা, দূর থেকে ভেসে আসছে নাম না জানা পশু পাখির ডাক, গা হিম করা শিয়ালের ডাকে কেঁপে কেঁপে ওঠছিল সবার শরীর, অনেকগুলো কাঠ একত্র করে আগুন জ্বালানো হয়েছে, আর তার ধারে গোল হয়ে বসে ফল খাচ্ছে সাদিক, আকাশ আর রীতি, সবার চোখে মুখে একটাই চিন্তার ছাপ আর সেটা হলো কি করে তান্ত্রিক খুঁজে বের করা যায়,,
হঠাৎ করে আকাশ বলে উঠলো আমরা কি কাল থেকে ওই শয়তান কে খোঁজা শুরু করবো, আর আমাদের তো সব গুলো গুহা খুঁজে দেখতে হবে, আমি জঙ্গলে থাকার সময় অনেকগুলো গুহা দেখতে পেরেছি,, আর সেগুলো খুঁজতে তো অনেক সময় লাগবে,,
এক নাগারে সব কথা বলে থামলো আকাশ, সাদিক তার কথা শুনে তার সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি উপহার দিলো আকাশ কে,
এর অর্থ আকাশ জানে, এর অর্থ হলো, সাদিক জানে কি করতে হবে আর সাদিক তাকে আর কিছু বলতে না করছে,
আকাশ তাই আর সাদিক কে ঘাটালো না, নিজের মনে ফল খেয়ে প্রকৃতির কাজ সেরে মাথার নিচে তার ব্যাগ চাপিয়ে বালির উপর শুয়ে পড়লো,, অনেক ক্লান্ত সে, তার আর কাজ করার মতো শক্তি নেই, এনার্জি প্রয়োজন তার এখন, আর এই মুহূর্তে যেটা একমাত্র ঘুমই তাকে দিতে পারে,,

সাদিক আর রীতিও দেরি না করে যার যার মত শুয়ে পড়লো, সাথে সাথে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলো তারা,
হঠাৎ করে খস খস শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো সাদিকের, আস্তে করে চোখ মেলে দেখে কয়েক জোড়া উজ্জ্বল চোখ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে, সাদিক আর দেরি না করে কোমরে থাকা পিস্তল বের করে একটা ফাঁকা গুলি করলো, গুলির শব্দে কেঁপে উঠলো চারপাশ, আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে লাগলো সেই চোখ গুলো, আর ততক্ষণে জেগে গেছে ওরাও, আর কিছু বুঝতে পারে নি ওরা, তাই তারা জলদি সাদিক এর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, তখনও সাদিক পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল, বন্দুক থেকে তখনও বের হচ্ছিল বারুদের গন্ধ, রীতি সাদিক কে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?
সাদিক খুলে বললো সব, আর এটাও বললো যে, হয়তো কোনো হিংস্র হায়েনা না হয় শিয়ালের দল ছিল ওগুলো, আর একটু দেরি হলেই ঝাঁপিয়ে পড়তো আমাদের উপর,
সাদিক বললো আমাদের একদম ঠিক হয় নি সবাই এক সাথে জেগে থাকা, তাই বলে সাদিক বসে পড়লো আর বাকিদের বললো শুয়ে পড়তে আর নিজে দুই ঘন্টা পাহারা দিবে সেটাও জানালো, আর দুই ঘন্টা পর আকাশ কে জাগানো হবে, তার দুই ঘন্টা পর রীতি কে, এই ভাবেই পালা করে জেগে থাকবে তারা,

আস্তে আস্তে পূর্ব দিগন্তে সূর্যের আলো দেখা দিতে শুরু করলো, রীতি আগুনে কয়েকটা কাঠ দিয়ে গিয়ে বসে পড়লো নদীর তীরে, শেষ প্যারায় ছিল সে, ওরা তখনো উঠে নি, উপভোগ করছিল সেই অপরূপ সুন্দর দৃশ্য,,
সাদিক এর ঘুম ভেঙ্গে যায়, উঠে দেখে রীতি নেই সেখানে,
একটু খুঁজতেই পেয়ে যায় তাকে, আস্তে করে গিয়ে দাঁড়ায় তার পাশে, রীতি প্রকৃতি দেখায় এতোটাই মগ্ন ছিল যে সে সাদিক কে দেখতেই পারে নি, তার মুখের এক পাশ চুল দিয়ে ঢেকে গিয়েছিল আর সূর্যের প্রথম লাল আভা তার মুখে পড়ছিল,
সাদিক শুধু তার অবাক নয়নে তা অবলোকন করছিল, সেই সময় রীতি কে তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী মনে হচ্ছিল,,
সাদিক গিয়ে রীতির পাশে বসে পড়লো, তাকে ডিস্ট্রাব করার এক ফোটাও ইচ্ছা সাদিকের নেই, সে শুধু তাকিয়ে মন্ত্র মুগ্ধতার সাথে রীতি কে দেখে যাচ্ছিল,,
রীতি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার সাদিক এর দিকে তাকালো তার পর বললো, এই ভাবে কি দেখো, বলেই আবার প্রকৃতি দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো, এই অবস্থায় রীতিকে যেনো আরো মায়াবী আরো রহস্যময়ী মনে হচ্ছিল, রীতির সৌন্দর্য যেনো বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছিল তার এই নিস্তব্ধতা,,
সাদিক রীতির কোথায় বললো তোমায় দেখি,,
রীতি আর কিছু বলে নি,
ওভাবেই কেটে যায় কয়েক মুহূর্ত, রীতি উঠে পড়ে তার জায়গা থেকে, কিন্তু সাদিক ঠায় বসে থাকে তার জায়গায়, মনে মনে পরিকল্পনা করতে থাকে সেই তান্ত্রিক কে রাজি করানোর,,

কালকের নিয়ে আসা ফল গুলো দিয়ে সকালের খাবার শেষ করলো, তার পর তারা বেরিয়ে পড়লো, সাদিক শুধু গুহার সামনে গিয়ে কি যেনো দেখে আর ফিরে আসে, এই ভাবে বেশ কয়েকটা গুহা ঘোরার পর সাদিক একটা গুহার সামনে এসে দাঁড়ায় আর বলে পেয়ে গেছি আমাদের কাঙ্খিত বস্তু……

চলবে………

About সাদিক হাসান

Check Also

রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৪)

তোকে শয়তান এর কাছে বলি দিতে হবে একটা যুবতী মেয়ে, একটা যুবককে আর একটা পনেরো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *