রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৮)

শুরু হতে লাগলো দমকা বাতাস, বাড়ির দরজা জানালা জোরে জোরে শব্দ করে খোলা মেলা করতে লাগলো। বাড়ির ভিতর থাকা মরা পাতা গুলো এদিক থেকে সেদিকে উড়ে বেড়াতে লাগলো, বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দ সবার ঘাড়ে শিহরণ দিয়ে গেলো, এক অজানা আতঙ্ক সবার মনে বলতে লাগলো যেখান থেকে এসেছিস সেই রাস্তায় ফিরে যেতে, কিন্তু দরজা যে বন্ধ আর যে উপায় নেই ফিরে যাওয়ার। এখন সময় শুধু অপেক্ষার, এই সময়, তাদের যেই দিকে নিয়ে যাবে তাদের সেই দিকেই যেতে হবে। সময় যে বড় নিষ্ঠুর।
আবার সেই বাতাস ঘুরপাক খেতে লাগলো বাড়ির মাঝ বরাবর,
সবার চোখে মুখে ভয় থাকলেও তান্ত্রিকের চোখে ভয়ের লেশ মাত্র নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেনো এই সময়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল, তার চোখে মুখে এক ধরণের সজীবতা লক্ষ করে সাদিক, সে মনে মনে প্রার্থনা করে যেনো তার মনের সন্দেহ যেনো ভুল হয় আর তান্ত্রিক যেনো সব কিছু খুলে বলে
আর তিথি রা যেনো ভালো করে মুক্তির সাধ গ্রহণ করতে পারে,

হঠাৎ করে সব বাতাস থেমে গেল, উড়তে থাকা পাতা গুলো
আবার মাটিতে পড়ে গেলো, চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেনো সেই নিস্তব্ধতা জানান দিচ্ছে কোনো চরম বিপদের। যার জন্য সাদিক রা মোটেও প্রস্তুত নয়।
তখন কথা থেকে যেনো তিথীর ভারী কন্ঠস্বর শোনা গেলো,
সে হুংকার দিয়ে বললো,
তোদের একবার সুযোগ দিয়েছিলাম এখান থেকে যাওয়ার জন্য কিন্তু তোরা সেই সুযোগ নিস নি, বরং তোরা আবার ফিরে এলি এখানে, এই মৃত্যুপুড়িতে, এইবার তোরা একা আসিস নি আবার সাথে করে একটা বুড়ো কে নিয়ে এলি,, তোদের যখন মরার এতই শখ তখন সেটা আমরা পূরণ করবো,, বলেই ধোঁয়ার সেই কুণ্ডলি পাকিয়ে সামনে এসে এক অন্য রূপে হাজির হলো তিথী, আসলাম আর সুমন। যে রূপ আগে দেখে নি তারা।
তাদের সেই রূপ দেখে চিৎকার দিয়ে সাদিক কে আকরে ধরে রীতি। আকাশ সেই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে হাত দিয়ে নিজের চোখ আড়াল করে ফেলে সে। কিন্তু কোনো ভাবান্তর লক্ষ করা যায় না তান্ত্রিকের মুখে। সে যেনো এইসব দেখে অভ্যস্ত।।
যদি তিথীদের এই রূপ কোনো সাধারণ মানুষ দেখতো তাহলে সেখানেই সেন্স হারাতে হতো তাকে,
কি বীভৎস সেই রূপ,
আসলামের গায়ে ছিল অসংখ্য ক্ষতর দাগ, যেখানে ফুটে উঠেছে ডাকাতদের অসহনীয় অত্যাচার, আর তার মাথা ছিল ঘাড় থেকে আলাদা, সেটা ধরা ছিল সেই আসলামের হাতেই,,
আর তিথীর শরীর ছিল অর্ধেক খোলা, সেখান দিয়ে যেই অংশ দেখা যাচ্ছিল সেখানেই কিলবিল করছিল অসংখ্য পোকা আর তার চোখ ছিল না, শুধু কোটরের ওখানে ছিল গর্ত আর সেখানেও কিলবিল করতে দেখা যাচ্ছিল অজস্র পোকা।
আর সুমন এর দেহের ঠিক মাঝ বরাবর ছিল বিশাল একটা গর্ত, যেখান দিয়ে দেহের এপাশ ওপাশ সব দেখা যাচ্ছিল, সেখানে শুধু ঝুলে ছিল কয়েকটা সাদা হাড়।।
যে কেউ এই সব দেখলেই সাথে সাথে হার্ট আ্যটাক করে মারা যেতো,,
তিথীরা ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে লাগলো সাদিকদের দিকে,
তাদের যেনো কিছুই করার ছিলো না এই দৃশ্য আর পরিস্থিতি যেনো তাদের বোবা করে দিয়েছে, তাই তারা কিছুই বলতে পারছিল না, যেই তিথী এগিয়ে গিয়ে সাদিকের কলার ধরবে তখন হঠাৎ তান্ত্রিক তার গায়ের চাদর থেকে কি যেনো একটা গুড়া বের করে ছুরে দিলো তিথীর দিকে, সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে দুই পা পিছিয়ে গেলো সে, তার এই দৃশ্য দেখে আসলাম আর সুমন ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগলো তান্ত্রিকের উপর, তখন সে ওই গুড়া তাদের উপরেও নিক্ষেপ করলো আর ওরাও তিথীর মতো দূরে ছিটকে পড়লো।
তখন দেরি না করে তান্ত্রিক তার জামার ভিতর থেকে একটা বোতল বের করে তার মুখ খুলে দিলো, সাদিক শুধু এইটুকু দেখলো যে বোতল টি ছিল কাঁচের। বোতল খোলার সাথে সাথে সেখান থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করলো আর সেটা গিয়ে ঘিরে ধরলো তিথী, সুমন আর আসলাম কে। সেই ধোঁয়া টেনে আনতে লাগলো ওদের ওই বোতলের ভিতর, তারা যখন ওই বোতলের ভিতর পুরোপুরি ভাবে প্রবেশ করলো তখন তান্ত্রিক
সেই বোতলের মুখ বন্ধ করে দিলো আর বোতল টা হাতে নিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসতে লাগলো তান্ত্রিক। সেই বোতলের ভিতর শুধু দেখা যাচ্ছিল তিথিদের আবছা ছায়া।
সাদিকরা শুধু হতভম্ব হয়ে দেখছিল তান্ত্রিকের এই সব কর্মকান্ড। কিন্তু তাদের কিছু করার মতো পরিস্থিতি ছিল না, একের পর এক দৃশ্য তাদের পাথর করে দিয়েছিল, কিন্তু তাদের অবাক হওয়া কেবল শুরু, তারা জানতো না যে তান্ত্রিক তাদের নিয়ে কি পরিকল্পনা করছিল, তাদের ঘোর কাটলো যখন তান্ত্রিক তাদের সামনে এসে কি যেনো একটা ছুরে দিলো তাদের দিকে, একে একে মাটিতে পড়ে গেলো রীতি আর আকাশ।
শেষে যখন সাদিক মাটিতে পড়ে যাবে তখন তার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বের হলো সেটা হলো ” শয়তান” আর মাটিতে পড়ার আগে শুধু তান্ত্রিকের হাসির শব্দ সাদিকের কান পর্যন্ত পৌঁছালো।।।

মিট মিট করে চোখ খুলে তাকালো সাদিক, সামনে তাকিয়ে দেখলো বিশাল একটা আগুন জ্বলছে উঠোনের মাঝে, আর তার সামনে কালো আলখাল্লা পড়া একজন মানুষ অদ্ভুত সব মন্ত্র উচ্চারণ করছিল, যা সাদিকের বোধগম্য নয়, একটু ভালো করে দেখার পর সাদিক বুঝতে পারলো যে সেই মানুষটি আর কেউ নয়, সেটি ছিল ওই তান্ত্রিক। আর মুখের দাড়ি সব কাটা ছিল।।আর আগুনের সামনে রাখা ছিল সেই বোতল যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে তিথীদের।
সাদিক উঠার চেষ্টা করলো কিন্তু উঠতে পাড়লো না, তার পর সে ভালো করে লক্ষ করে দেখলো না তার হাত বাঁধা রয়েছে একটা পিলারের সাথে আর তার হাত পা খুব শক্ত করে বাঁধা হয়েছে, আর তার অপর দুই পাশে বাঁধা হয়েছে রীতি আর আকাশ কে, ওদের সেন্স এখনো ফেরে নি,, সাদিক আরেকবার সেই বোতলের দিকে তাকালো আর দেখতে পেলো ভিতরে থাকা ধোঁয়া গুলো বারবার আঘাত করে যাচ্ছে সেই কাঁচের বোতলের গায়ে, কিন্ত এক চুল পরিমাণ নরাতে পারছে না সেটি,,
সাদিক আস্তে আস্তে ডাক দিলো রীতি আর আকাশ কে, একে একে চোখ মেলে তাকালো দুইজন, পরিস্থিতি বুঝে উঠতে সময় লাগলো না ওদের। আর বাকি সব কথা জেনে নিলো সাদিকের কাছ থেকে। তাদের এখন বসে থেকে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না,,
হঠাৎ করে তান্ত্রিক উঠে দাঁড়ালো আর বোতল হাতে এগিয়ে আসলো সাদিকদের দিকে, সাদিক শুধু একবার জিজ্ঞেস করলো তাকে সে কি চায়, কি তার উদ্দেশ্য?

তান্ত্রিক একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বললো ” অমরত্ব”
তার এই কথা শুনে কেঁপে উঠল ওরা, মনে পড়ে গেল তিথীদের সাথে ঘটা ঘটনা গুলো মনে পড়লো রহিমার করুন পরিণতির কথা, সাদিকের সব ভাবনায় ছেদ ফেলে তান্ত্রিক বললো,,

সেই সত্তর বছর ধরে আমি অপেক্ষা করছি এই দিনের, কিন্তু আমার আশা পূরণ হতো আগেই, কিন্তু ওই ডাকাত দলের সর্দার সব স্বপ্ন ভেঙে দেয় আসলামদের মেরে, আর ওই রহিমার লাশ আমি খুঁজে পাই আমার ডেরায়।। এর পর আমি চলে যাই সেই গুহাতে, সেখানে গিয়ে আমি ধ্যান করতে থাকি, আর বুঝতে পারি যে ওই বাড়িতে তিথিরা আত্মা হয়ে আছে, কিন্তু আমি সেখানে প্রবেশ করতে পারবো না একা একা, কারণ আমি শয়তানের উপাসক, ওই বাড়িতে পৌছাতে আমার লাগতো ভালো, সাহসী, আর বুদ্ধিসম্পন্ন যুবক আর যুবতীকে যার সব বৈশিষ্ট্য তোদের মধ্যে রয়েছে, আর আমার আলাদা করে কিছু করতে হয় নি, তোরা নিজেরাই আমাকে খুঁজতে চলে গেলি সেখানে, কিন্তু তোরা আমার খোঁজ কি করে পেলি সেটা আমার জানা নেই।।
এইবার তোদের সবাইকে বলি দিয়ে আমি হবো অমর, ফিরে পাবো আমার রূপ যৌবন সব কিছু,,
এই বলে তান্ত্রিক সেই কাঁচের বোতল মুখের সামনে এনে বলতে শুরু করলো, তোরা জানতে চাস না তোদের বড় মার কি হয়েছিল, যার জন্য তোরা তোদের জীবন দিলি, যার জন্য এখনও তোরা অপেক্ষা করে যাচ্ছিস, জানতে চাইবি. না সে তোদের কতটা ভালোবাসত, তাহলে শোন,, তান্ত্রিক সাদিকদের উদ্দেশ্য করে বললো তোরাও শোন তবে,,
তান্ত্রিক শুরু থেকে সেই পাগলের সব কথার পুনরাবৃত্তি করে গেলো,, আর বললো এখন বুঝতে পারছিস কাদের রক্ষক হয়ে ছিলি তোরা এতোদিন, আর সাদিকদের উদ্দেশ্য করে বললো এরা তোদের মুক্তির জন্য আমাকে দিয়ে সব কথা বলানোর জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখলো তোরা তাদের মারতে চাইলি,, অবশ্য ভালোই করেছিস, ওদের জন্য আমি সময় পেয়েছি তোদের বন্দি করার, বলেই আবার হা হা করে হাসতে লাগলো তান্ত্রিক এর সব কিছু তিথীদের সামনে স্বীকার করা দেখে তার ঠোঁটে এক বাঁকা হাসির রেখা দেখা দিলো, মনে হয় সে এই সময়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা গেলো না সাদিককে।
কিই বা করতো, তার হাত পা যে বাঁধা,
তান্ত্রিক আবার সেই কাঁচের বোতল টা আগুনের সামনে রেখে
নিজে বসে পড়লো তার সামনে,,

আর আবার জব করতে লাগলো সেই বিদঘুটে মন্ত্র গুলো,,
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে শাঁ শাঁ শব্দ করে কি যেনো বেরিয়ে গেলো তান্ত্রিকের কান ঘেঁষে আর সেই সাথে বিকট একটা শব্দ শোনা গেলো আর শেষে তার কানে ভেসে এলো কাঁচ মাটিতে পড়ার শব্দ।

তান্ত্রিক কানে হাত দিয়ে বসে পড়লো, যখন সে চোখ খুলে তাকালো তার সামনে দেখতে পেলো তিথী, আসলাম আর সুমন তাদের অগ্নি রূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের সামনে,, আবার তান্ত্রিক পিছনে তাকালো, আর সেখানে তাকিয়ে আরো অবাক হলো, কারণ সে দেখলো,,
সাদিক পিস্তল হাতে তার দিকে তাক করে আছে আর তার পিস্তল দিয়ে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছিল, আর তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে রীতি আর আকাশ, তাদের হাতেও রয়েছে সেই ধারালো ছুরি।
সাদিকের ইশারায় আকাশ ছুটে গেলো মগে রাখা পানির দিকে যেটা একটা তাকের উপর রাখা ছিল,, আর আকাশ সেটা তুলে নিয়ে গিয়ে পানি ঢেলে দিলো সেই পাউডারের উপর যেটা দিয়ে বন্দি করা হয়েছিল তিথীদের, তান্ত্রিক সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিল আগুনের সামনে, সেই পাউডার রাখা সাদিক আগেই দেখতে পেয়েছিল তাই সে আকাশ কে আগে থেকেই সব বলে দিয়েছিল তাকে কি করতে হবে।
তান্ত্রিক যেনো তার সব অস্ত্র হারিয়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল নিচের দিকে, কারণ সে জানে তার কি করুন পরিণতি করতে চলেছে তিথীরা।।
আসলাম আর সুমন ধোঁয়া হয়ে তান্ত্রিকের চারপাশে ঘুরতে লাগলো আর তিথী এগিয়ে এলো সাদিকদের কাছে আর বলতে লাগলো,,
তোদের ভুল বুঝে তোদের মারতে চাওয়ার জন্য আমরা ক্ষমা চাচ্ছি,, আর তোরা যদি না থাকতি তবে হয়তো আমাদের কেয়ামত পর্যন্ত থাকতে হতো আর এই সময়ে আমাদের হাতে প্রাণ চলে যেতো কত নিরীহ মানুষদের, আর তোদের জন্যই আমরা দেখতে পেরেছি বড় মার আড়ালে এক শয়তান কে,
আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য তোদের অসংখ্য ধন্যবাদ আর আমাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য তোদের বলার মতো ভাষা আমার নেই। তোরা সত্যই মহান। এইবার আমরা নিশ্চিন্তে মুক্তি পাবো, আর যেটা হবে তোদের জন্য।
আকাশ বললো সেই সব ঠিক আছে, কিন্তু ওই শয়তান তান্ত্রিকের সাথে তোমরা কি করবে?
তিথীর মনে একটা রহস্য ঘেরা হাসি ফুটে উঠলো, সে বললো তোদের যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে, তোরা যখন ইচ্ছা এখানে আসতে পারবি আর মানুষদের বলবি এখানে আর কোনো বিপদ নেই, তিথী কয়েক মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো আর ফিরে এলো হাতে করে একটা বাক্স নিয়ে, আর সেটা সাদিকের হাতে দিয়ে বললো আমার একটা কথা রাখতে হবে তোদের, আজ পর্যন্ত যারা আমাদের হাতে মারা গেছে তাদের পরিবার কে এখান থেকে ক্ষতিপূরণ দিবি তোরা, এটা আমার একান্ত অনুরোধ তোদের কাছে।।
সাদিক কে আর আলাদা করে বলতে হলো না কি আছে সেই বাক্সে, কারন সে জানে সেখানে রয়েছে রহিমার সব সোনা আর সম্পদ। যার রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছে এদের। সাদিক খুশি মনে সেটি নিয়ে ধন্যবাদ জানালো তিথীকে।
আর তিথী বললো যদি কারো পরিবার খুঁজে না পাওয়া যায় তাহলে তার সম্পদ যেনো সাদিক নিজের কাজে লাগায়।
সাদিক তিথীর কথা শুনে মুচকি হাসলো।

সাদিকরা ওই বাড়ি থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো, কিন্তু সেই সময় ওদের কানে ভেসে আসলো এক মরণচিৎকার
যেটা আর কারো ছিল না, সেটা ছিল ওই তান্ত্রিকের,

সাদিক তিথীদের বলে ওই তান্ত্রিক কে বাঁচিয়ে দিতে পাড়তো, কিন্তু সে মনে প্রাণে চায় এই সব শয়তান আর বিশ্বাসঘাতকদের যেনো কঠিন শাস্তি হয়,
সাদিক সহ বাকিরা একবার পিছনে তাকালো আর দেখতে পেলো তিনটা ধোঁয়ার কুণ্ডলি উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আর মেঘের সাথে মিশে গিয়ে তিনটি আবছা প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হলো, যা ছিল আসলাম, সুমন আর তিথীর। যা হাসি মুখে তাকিয়ে ছিল
সাদিকদের দিকে আর বিদায় দিচ্ছিল সাদিকদের।
সাদিক শুধু ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে একবার স্যালুট দিলো ওদের, কারণ যারা নিজেদের রক্ষা করার কথা ভুলে যায় অপরের কথা রাখতে গিয়ে, আর যারা নিজেদের প্রাণ দিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করে না, এরাই তো আসল হিরো। এরই তো রক্ষক।
যদি সমাজ এদের দেখে কিছু শিখতে পাড়তো, তাহলে দেশ আজ এই অবস্থায় থাকতো না, তাই সাদিক আর চুপ থাকতে পারে নি, এদের স্যালুট না দিলে যে আসল রক্ষকদের অসম্মান
করা হবে, সাদিকের দেখা দেখি রীতি আর আকাশও স্যালুট করলো ওদের, আর এগিয়ে চললো সেই বুড়োর বাড়ির উদ্দেশে,
গভীর জঙ্গল, সাদিক জানতো তারা পথ হারাতে পারে, তাই সে আগে থেকেই একটু পর পর গাছের গায়ে চিহ্ন করে রেখেছিল যাতে পথ ভুল না হয়।
একটু সুযোগ পেয়েই রীতি সাদিককে প্রশ্ন করে যে সে কি করে মুক্ত হয় আর সে কি করে বুঝতে পারে যে তান্ত্রিক তাদের ধোকা দিবে,
সাদিক বাঁকা হাসি হেসে বলতে আরম্ভ করলো,,
আমি যখন তোমাদের থেকে আলাদা হয়ে যাই তখন আমার কাছে আবার সেই পাগল আসে আর আমাকে সাবধান করে দেয় ওই তান্ত্রিক এর থেকে সাবধান হওয়ার জন্য, আর আমাকে আমার মস্তিষ্কের কথা শুনতে বলে, আমি বুঝতে পারি নি তার কথা, তার পর আমি তার কথা বিশ্বাস করতে চাই নি, তাকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবো আর বলতে যাবো সে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়, সে আমার সামনে রেখে যায় রহস্য, আমি খুঁজতে থাকি তার সমাধান, আর তখন তোমরা আমাকে খুঁজে পাও,
এর পর আমি তান্ত্রিকে পরীক্ষা করার জন্য তাকে তান্ত্রিক মশাই বলে ডাক দেই, কিন্তু সে কোনো প্রতিবাদ করে না, এর থেকে আমার সন্দেহ আরো দৃঢ় হয়ে উঠে, কারণ একজন ভালো হয়ে যাওয়া মানুষকে যদি কেউ তার অতীত মনে করে দেয় তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই তার রাগ হওয়া উচিত,
কিন্তু আমি মনে মনে ভাবি হয়তো অনেক দিন কারো কাছ থেকে অন্য নাম না শোনার ফলে সে কিছু বলে নি, এর পর তান্ত্রিকের মুখে হাসি যখন আমাদের সবার চোখে ভয় ছিল, এর পর ওই বাড়িতে আমাদের জোর করে ঢোকানো আমার সন্দেহ কে বাড়িয়ে তোলে, তাই আমি আমার ছোট ছুরি আমার ফুলহাতা শার্টের হাতের মাঝে লুকিয়ে নেই আর রিভলভার টা কোমরের এমন জায়গায় গুঁজে রাখি যেখান থেকে কেউ খুঁজে না পায়,,
এর পর সুযোগ বুঝে সেই ছুরি দিয়ে আমার হাতের দরি খুলে তোমাদের মুক্ত করি আর রিভলভার বের করে তিথীদের আটকে রাখা বোতলকে নিশানা করে গুলি ছুড়ি, আমি তখনই ওই শয়তান কে আমার বন্দুকের গুলি দিয়ে মেরে ফেলতে পাড়তাম, কিন্তু তখন শুধু সে মারা যেতো, কিন্তু আমি চেয়েছিলাম যেনো সে তিথীদের হাতে মরে আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেনো সে মৃত্যুর ভয়ে বারবার মরে, এটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় সাজা।

সাদিক রা ফিরে এলো সেই বুড়োর বাড়িতে, আর সব ঘটনা তাকে খুলে বললো, আর তাদের ট্রেন আসতে এখনও চারদিন বাকি থাকায় সে ওই বুড়োর সাহায্যে যারা ওই বাড়িতে গিয়ে প্রাণ হারিয়ে তাদের পরিবার কে সমান ভাবে ভাগ করে দিলো ওই সোনার মোহর, কিন্তু অনেকের কোনো পরিবার ছিল না, তাই সে অর্থ সাদিকের প্রাপ্য, কিন্তু সে তা না নিয়ে সেগুলো ওই বুড়োর কাছে দিয়ে দেয়,, আর বলে যে যখন যার অর্থের খুব প্রয়োজন পড়বে তখন যেনো সে ওই অর্থ দিয়ে ওই মানুষকে সাহায্য করে,
গ্রামের মানুষ জানতে চায় কি হয়েছিল ওই বাড়িতে, সাদিক তাদের সব খুলে বলে শুধু তান্ত্রিকের কথা বাদে আর বলে বড় মার মৃত্যুর কথা শুনে তিথিরা চলে গেছে।

চারদিন পর সাদিকরা ওই বুড়ো আর বুড়ির থেকে বিদায় নিয়ে
উঠে পড়ে ট্রেনে। ঝিক ঝিক শব্দ করে এগিয়ে যেতে থাকে ট্রেন, আস্তে আস্তে ছোট হতে থাকে চন্দনপুর। যেই জায়গার কথা কোনো দিন ভুলতে পারবে না ওরা,
রীতি সাদিকের ঘাড়ের উপর নিজের মাথা রেখে জানলা দিয়ে বাইরের প্রকৃতি দেখায় ব্যস্ত, কিন্তু সাদিক কিছুতেই ভুলতে পারছে না সেই গ্রাম, যা থেকে অনেক কিছুই শিক্ষা গ্রহণ করেছে ও।
আর একটা সমীকরণ তার মাথার নিউরন গুলো ফালা ফালা করে দিচ্ছে, সেটা হলো কে ছিল সেই পাগল যে বিনা কারণে ওদের এতো সাহায্য করলো, আর সে কি করে হঠাৎ করে অদৃশ্য হতে পারে, এই একটা প্রশ্ন তার মাথায় বারবার বাড়ি খাচ্ছিল, উত্তর একটাই হতে পারে, তবে সেও কি কোনো অশারীরী ছিল!
আর সহ্য করতে পারলো না সাদিক, এমনিতেই কয়েকদিনের প্রচণ্ড ধকল আর মাইগ্রেনের যন্ত্রণা আর এই একটা প্রশ্ন যেনো ছিড়ে ফেলে দিতে চাচ্ছিল তার মাথা, তার মাথা সে রাখলো রীতির কাঁধের উপর, রীতি পরম মমতায় তার হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো সাদিকের ঘন চুলের ভিতর, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো তার, চোখ শেষ খুলে রাখার চেষ্টা করেও পারলো না আর, একটা প্রশ্ন মাথায় নিয়েই পুরোপুরি ভাবে চোখ বন্ধ করলো সাদিক আর সেটা হলো কে ছিল সেই পাগল?

*** সমাপ্ত ***

সাদিকের জন্য গল্পটা শেষ হয়েও শেষ হয় নি, কিন্তু আপনাদের কাছে আমি কোনো প্রশ্ন রাখবো না, গল্প টা এখনও সম্পূর্ণ হয় নি ওই জঙ্গলের জন্য, এখনো সমাধান হয় নি একটা রহস্যের
আর সেটা হলো কে ছিলো সেই পাগল?

একটা বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে……

পাগল টা হাঁটু গেড়ে বসে আছে, অনেকটা ক্ষমা চাওয়ার মতো করে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে,
তিথী, আসলাম এবং সুমন। পাগল টা তাদের উদ্দেশ্য করে বললো, আমাকে মাফ করে দাও, আমি জীবনে অনেক ভুল করেছি, আর আমি তোমাদেরকেও মেরে ফেলেছি সামান্য কয়েকটা সোনার মোহরের জন্য, আমি ইজ্জত নিয়েছি তোমার মতো এক মহৎ নারীর, আর রেহাই দেই নি এই ছোট বাচ্চাকেও
আমার এই সব পাপের জন্য আমিও যে মুক্তি পাই নি, আমি ঘুরে বেরিয়েছি এই জঙ্গলে, যদি তোমরা আমাকে ক্ষমা করো তাহলেই আমার মুক্তি হবে, আমি শুধু ঘুরে বেড়ায় নি, আমি তোমাদের সব তথ্য জানতে পারি, আর জানতে পারি ওই তান্ত্রিক আর বড় মার সব শয়তানী সম্পর্কে।
কিন্তু আমার যে ওই বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ ছিল,
কারণ আমি যে ডাকাত সর্দার লালু,,
কিন্তু আমি তোমাদের মুক্তির সব রকম চেষ্টা করে গেছি, আমিই সাদিকদের সব বলি আর বলি ওই তান্ত্রিক এর ব্যাপারে, পরে আমিই তাদের সাবধান করে দেই যাতে তারা ওই তান্ত্রিকের ফাঁদে না পড়ে, দয়া করে আমাকে মাফ করে দাও, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি।
লালু অনেক আকুতি মিনতি করে তিথীদের কাছে,

তিথী কিছুক্ষণ ভেবে বলে, সেদিন তোর হাতে যদি আমাদের মৃত্যু না হতো তাহলে আমাদের বলি হতে হতো ওই তান্ত্রিকের হাতে, আর তখন আরো ভয়ানক হতো, আর তোর জন্যই আমরা মুক্তি পেয়েছি, তাই আমরা তোকে মাফ করে দিলাম,
এর পর সবাই একসাথে মুক্ত হয়ে উড়াল দিলো আকাশের পথে,,সাধ গ্রহণ করতে লাগলো মুক্তির…

**** সমাপ্ত ****

About সাদিক হাসান

Check Also

রক্ষক: সাদিক হাসান (পর্ব-১৪)

তোকে শয়তান এর কাছে বলি দিতে হবে একটা যুবতী মেয়ে, একটা যুবককে আর একটা পনেরো …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *